বৃষ্টি একটি সুর, চিন্তাভাবনার অনুঘটক এবং অনুপ্রেরণার প্রতীক। বৃষ্টিসিক্ত আবেগ, ভালোবাসা ও অনুভূতিকে উপভোগ করার জন্যে কয়েকজনের কবিতা নিয়ে “বৃষ্টি দিনের কবিতা” প্রকাশিত হইলো। বৃষ্টি মনোরম, তাই সবচেয়ে অন্ধকার দিনেও আমাদের স্মৃতিতে হতে পারে বিচ্ছুরিত। এই ২৬ জন কবিকে কিংবদন্তি‘ র পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা…
মাসুদার রহমান
আমব্রেলা কলোনি
কলোনির কেউ নই। হতে পারি এক ঝাপটা হাওয়া
গলির এপথ দিয়ে ঢুকে
ওপথে বেরিয়ে যেতে
তোমাকে দেখেছি আর থমকে গিয়েছি
হাওয়া থমকে গেলে কী ভ্যাপসা গরম, পরে বৃষ্টি নেমেছিল
বৃষ্টির দিনে সমস্ত পৃথিবী এক আমব্রেলা কলোনি
সবচেয়ে উজ্জ্বল ছাতাটি তোমার
জহির হাসান
বৃষ্টি ফোটারা অভিনয় বুঝে না
রিহার্সল করাইতে গেছি
বৃষ্টি শেষে-
তারে ঝোলা দুই বৃষ্টির ফোঁটা
তাদেরে কইলাম
একবার জড়ায়ে ধরবা
তারপর ছাড়ি দিবা
আবার নিজ পজিশনে সরি দাঁড়াবা
যেন লোকে ভাবে
আরেকবার জড়ায়ে ধরে না ক্যান!
হায়, তারা মুখামুখি
আসা মাত্রই জড়ায়ে এমনই ধরলো
কেউ কাউরে ছাড়েই না!
আমি কই
ওগো একীভূত বৃষ্টির ফোঁটাদ্বয়
এইটা তো নাটকের
রিহার্সেল!
তোমাদের মধ্যে ফের দূরত্ব রচনা কর!
শিবলী মোকতাদির
বৃষ্টিবালা
বৃষ্টি পড়ছে, টানা গদ্যে মাঝারি থেকে তীব্রতর!
তোমার মিষ্টিমুখর কুপ্রস্তাবগুলো ড্রেন থেকে ডোবালে
ভেসে গিয়ে জমা হচ্ছে সমুদ্রের নোনাজলে।
সাগরে হাঙর থাকে—এই ভয়ে ভ্রমণে বাগড়া দিয়ে
ঘাপটি মেরে বসে আছো বৃষ্টিব্রত শালপাতার ঘরে।
শাণিত বিদ্রূপে ঝরে পড়ছে সকল বৃষ্টি সৎ কদমের ডালে।
ওগো প্রস্তাব, মুচকি হেসে বলো তাকে
ভয় নেই, পুরনো প্যান্টের চেন টেনে
সে যেন আমার নতুন ছাতার নিচে আসে।
গুঁড়ো গুঁড়ো চুম্বনকণা ছড়িয়ে পড়ুক রাগে ও পরাগের
সৃষ্টি হোক বৃষ্টির বরকতে—সেই পদ্য প্লাবিত অক্ষরে!
ইমরুল হাসান
ফিরে যাচ্ছি
ফিরে যাচ্ছি, আবার আসবো বলে।
এই যেমন, বিদুৎ কর্মকর্তার বউ উঠলেন, দুইজন বাচ্চাসহ
বাপের বাড়ি কয়েকটা দিন থেকে আবার ফিরে আসবেন বলে।
জেলা মৎস্য অফিসারের তিনজন বন্ধু বউ-বাচ্চাসহ
ভেকেশন কাটিয়ে ফিরে চলেছেন;
তারাও আবার আসবেন কখনো সময় পেলে,
কথা দিলেন।
হিন্দু নব-দম্পতির হানিমুন হলো এই রাঙামাটিতেই
কী লাল বউটার কপালের সিঁদুর!
যদি তারা নাও আসেন কখনো, চিরকাল গল্প করবেন
এই ভ্রমণের;
বিয়েটা টিকে গেলে নাতি-নাতনিদেরও বলবেন হয়তো
কাঠের ব্যবসায়ী যিনি, উনাকে তো আসতেই হয়
এক সপ্তাহ পর পর;
রাঙামাটি তো এখন উনার বাড়ি ঘরের মতোই।
শেষ বাসে আরো অনেকের সাথে আমরাও ফিরে চলছি।
সূর্য ডুবে গেছে।
বৃষ্টি হচ্ছে একটু একটু।
পথ ভিজে যাচ্ছে।
অনেক হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত আমদের মেয়েটা এখন
তার মায়ের কোলে ঘুমাচ্ছে।
জেগে উঠে শে কি বুঝবে কোনদিন, তার কি মনে থাকবে
শেও এসেছিল রাঙ্গামাটিতে একদিন;
দেখেছিল পাহাড়, উঁচু নিচু পথ
গ্লানিময় জলের ছোট্ট শহর!
(২০০৬)
রাথো রাফি
বৃষ্টি
একদিন তুমি আবিস্কার করেছিলে
মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে
দীর্ঘ নির্জন সড়ক ধরে হাঁটা সত্যিই তুলনাহীন
তখন একটা বিশ্বস্ত হাত ধার পাওয়া প্রয়োজন ছিল খুব
আর খুঁজে পেয়েছিলে আমাকে সেদিন
তখন নির্জন দীর্ঘ পথ ধরে
মাথার উপর আমাদের ঝরছিল বৃষ্টি আর বৃষ্টি
ভেবেছিলাম এভাবে তুলনাহীন বৃষ্টিতে
ভিজতে থাকবো আমরা বহুকাল
সময়ের ধারাবাহিকতায় তুমিও আবিস্কার করলে
একে একে যুক্তিহীন আদিম বৃষ্টির অসুবিধাগুলো
বুঝতে পারলে শিশুর নষ্ট কাথা শুকোনো
কত কষ্টকর হয়ে ওঠে এমন বৃষ্টি-বাদলার দিনে
আজ এই বৃষ্টির দিনে শিশুরা
ঘর ছেড়ে খোলা মাঠে ছুটে যাচ্ছে দেখে
সর্দিজরের আশংকায় কেমন কাতর হয়ে পড়ছ তুমি
ভাবছো এমন দিনে শিশুদের স্কুলে
আসা-যাওয়ার শত ঝামেলার কথা
এখন বৃষ্টির চেয়ে সত্যি তাদের অনেক বেশি ভালবাস তুমি
আর আমি ভাবছি নিষেকের পর হায় কেন
কোনো ফুলেরই অস্তিত্ব থাকে না
বাঁশি নয়, যেনো বীজের গুঞ্জন
তাকে ডেকে নিয়ে গেছে অন্য পৃথিবীতে!
তবু এখনও দুপুর অন্ধকার করা বিরামহীন বৃষ্টির মধ্যে
দীর্ঘ রাস্তা ধরে আমি একা একা হাঁটি আর হাঁটি
অথচ তোমার খুব কমই মনে পড়ে
আমার এই আত্মায় চিরকাল ওই অদ্ভুত বৃষ্টিধারা ঝরে চলেছে
আবহমানকালের একটি কদমতলায় পৌছাবো বলে
কৃষ্ণ চিরদিন যেখানে বাঁশি বাজায়
আর সব চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতবিরেতে ছুটে আসে ব্যাকুল রাঁধা
আর আবিস্কার করে তারা
রাতভর বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ওই আদিম কদম গাছ
শত শত ফুল ফুটিয়ে কী অদ্ভুতভাবে হাসছে
যেনো তাদের আত্মার অপরূপ ছবি হয়ে গেছে
আর আমি ঘোর শ্রাবণ মাথায় করে মাঠের ওপর
আজও একা একা দাঁড়িয়ে আছি
দেখছি প্রায় শুকিয়ে আসা একটা ফুলের ওপর
কেমন করে লাফিয়ে পড়ছে ব্যাকুল বৃষ্টি ফোঁটাগুলো
আর ডাকছে– রাঁধা! রাঁধা!!
কিন্তু সে কিছুতেই আর চোখ মেলছে না
আর আমার হাতের খোলা ছাতা
বৃষ্টিতে বাতাসে মাঠের উপর গড়িয়ে চলে শুধু গড়িয়ে চলে
২৬ জুলাই, ২০১৬
পিয়াস মজিদ
রেইনি
বৃষ্টিবাদলার ঢাকা
মেঘদূতের মহল্লা
পুড়ে যাওয়া মল্লার
ভেজা আত্মার এস্রাজ
পট্যাটো রোস্টেড না ম্যাশ
ভ্যান গগ জানেন বেশ
এই কাদাপানির রাস্তা
সানাইয়ে বিষণ্ন বিসমিল্লা
ও মেয়ের স্তনের বনাঞ্চল
হঠাৎ প্রেম লেগে চঞ্চল
হু হু হাওয়ার সমাধি,
আজীবন রোদ মাথায়
আমি আজ তোমার
মেঘলা মনের মুখোমুখি।
শুভ্র সরকার
শ্রাবনের বৃষ্টি
বৃষ্টির কোন শহর নেই
মানুষের থাকে যেমন
বৃষ্টি পড়ছে, পুনশ্চ বৃষ্টি হবে
জানি এইরূপে
হাওয়ার হাহাকার
পাখিটি ভেজা অধিক
পর্দাহীন ছাতার মতো
পাখিটি আমাকে শিখিয়েছিল
পাখি সুন্দর বারবার
যেমন অদূরের পাহাড়
একটি পথশিশুর হাতে গোলাপ
প্রেম; একে অন্যের
ভেজা ভেজা বাগান
বাগানে ফুলেদের দু:সর্ম্পকের ভাই
ভ্রমরাসকল, নিবিড় মিশেছে যখন
আকাশটা মাঝে মাঝে খুলে ফেলছে
অন্ধকার
ভাসছে দিন
শব্দে, ঝরে পড়বার
হাসনাইন হীরা
বর্ষার ভাবসম্প্রসারণ
ধানকুলাতেও মেঘ উড়াচ্ছে কেউ
হৃৎপিণ্ডের ভেতর থেকেও
বেরিয়ে আসছে বর্ষার ফলক।
বর্ষা, কেবলই ঋতু নয়
বৃষ্টিও কেবল মেঘ থেকে আসে না।
চর্যার অনাদিকাল ঘুরে আসা
দায়গ্রস্থ পিতার হাহাকার থেকেও
নীলাকাশ ডুবে যেতে পারে!
বেহাল মাতৃত্বের ঋণ ঘোঁচাতেও
ভিজে উঠতে পারে সৃষ্টিমুখর বারান্দা।…
এভাবেই সৃষ্টির মহিমা
পৃথিবীতে সংসার পাতে কিনা!
চলো দেখে আসি, আনন্দের ক্ষত চিহ্নগুলো।
বিধান সাহা
সোনাই-মাধব
এইদিকে বৃষ্টি হচ্ছে, রেহনুমা।
ইশারায় আজ আমিও কত কথা যে কই!
ধরো, শিস দিতে দিতে হারিয়ে যাওয়া মানুষ
গানের অনুরাগে ফিরে এলো।
পাশাপাশি শুয়ে তাকে বলো
বৃষ্টি হলে তুমিও রবীন্দ্রগীত!
তোমার সংসার কেমন আছে?
গায়ত্রী-গদাধর?
দুপুরে চৈতালী-রোদ পড়েছিলো ভীষণ!
আর আমি একটি আমের পাতায়
ভুল করে নিজের নাম লিখেছিলাম- সোনাই-মাধব!
রিমঝিম আহমেদ
পাতা ও বৃষ্টির গান
১.
পাতা ভেসে যায়। ভেসে যায় কত পাতা
বৃষ্টি হচ্ছে ধ্বনি ও মর্ম ছুঁয়ে
আকাশে সজল ভারী মেঘ, আরও ভারী
মেঘমল্লার গেয়ে ওঠে কিন্নরী
পেখম মেলেছে দূরে কার ভেজা প্রাণ
নৌকো ডুবেছে মাঝনদী জলে, আহা!
অলস দুলছে দেউড়িতে ভেজা শাড়ি
কে যে পাশে এসে ধরেছে মাথায় ছাতা!
মন পোড়ে যায়, তার মন তবু থাকে
আবার কখনো পুড়তে করে না দ্বিধা
পিঁড়ি পেতে বসে অবসাদ বারোয়ারি
সেগুনপাতায় জল লিখে তার গান
বৃষ্টি হচ্ছে। ভেসে যায় যত পাতা
ডালে একা পাখি। পাখিটি ভীষণ একা
নীল নবঘনে শ্রাবণে একাকী বাড়ি
একা একা ভিজে। ভেজা মাঠে ছবি আঁকে
সারাজাত সৌম
পাগলা বুড়ো
বৃষ্টিতে তুমি মারা যাও—
তোমার দাঁত বেলিফুলের মতো ঠাণ্ডা
সুঘ্রাণ ছড়িয়ে দিচ্ছে সমস্ত বাগানে!
তুমি বুড়ো—
মারা যাও, ঠিক তার আগে
শিকড়ে আটকে পড়া তোমার মুখ
এমনকি আঙুলগুলো লতায় প্যাঁচানো
কে ধরে আছে?
কেইবা ধরে রাখে—
এই মুহূর্ত, সুন্দর নিবিড় চোখটাকে
ছুটে চলা সময়ের ভেতর—
তুমি একদিন তরুণ ছিলে।
ভেবো না—
বৃষ্টিতে আর কেউ নেই
তোমার শরীরে সে এক গাছ
ক্ষণে ক্ষণে ফুল ফুটে আর ঝড়ে
মাটি সংলগ্ন ছোট্ট বীজ
জানি না—কখন কবে পাখি এসে
তাকে ছুঁ মেড়ে নিয়ে যাবে
তোমার বাগানে।
দ্যাখো—
একটি ফুল বৃষ্টির ভেতর—
একটি ফুল বৃষ্টির মতো—
একটি ফুল বৃষ্টির চেয়ে দূরবর্তী—
তোমার চুলে হেসে হেসে দুলিয়ে দিচ্ছে
আমার মুখের চির আভা।
হাসনাত শোয়েব
বৃষ্টি হচ্ছে
পৃথিবীর পেট উজাড় করে বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু এখন শীতকাল। এই ঋতু বড্ড আগ্রাসী। হৃতপিণ্ড এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। এমন শীত থামানোর কোনো উপায়ই আমার জানা নেই। এইসব শীত আমাকে আরও বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। আমি শুষ্ক ত্বকের নিচে আড়াল করে ফেলি সব বিষণ্নতা। কারণ, পৃথিবীতে ভালো থাকা কিংবা না থাকা মানুষেরা একেবারেই আলাদা। ভালো থাকতে হলে আপনার প্রয়োজন এক খণ্ড পাথর, যেটা আপনি যখন তখন যাকে তাকে ছুড়ে মারতে পারবেন। পৃথিবীতে যারা সঠিক নিশানায পাথর ছুড়ে মারতে পারে, তারাই কেবল ভালো থাকতে পারে। আর একদল আছে যারা খারাপ থাকার ভান করে। তাদের দখলে কান্না। পৃথিবীর যে কোন কান্নায় তাই ভ্রম ও অস্পষ্ট। তার ঝরে যাওয়া আমাকে আক্রান্ত করে। কিন্তু আমি তাদের ঘৃণা করি। পৃথিবীর যে কোন কান্নারত মানুষকে আমার পাথর ছুড়ে মারতে ইচ্ছে করে। যেহেতু আমি সুখী মানুষ নই, আমার তাই কোন পাথরও নেই। আমি বসে বসে দেখি—পৃথিবীর যাবতীয় সুখী এবং অসুখী মানুষদের।
সাম্য রাইয়ান
বর্ষা অপেরা
অনাগত মেঘমল্লার
দগ্ধ হচ্ছে বন, আর তুমি ডুবে যাচ্ছো। এ কেমন ঋতু! তীর্থবনে— কৃষকের মৃত্যু ফুটে আছে রক্তিম কাঁটায়। ধ্বণিহীন, শোকবার্তার কাছে দৈব অনুরোধ, অনির্বাণ প্রেমিকার মতো জড়িয়ে দাও ফসলের ক্ষেত। যা কিছু উজ্জল মোড়কে, ঘ্রাণযুক্ত স্মৃতির পোষাক, খুলে, নগ্ন করে দাও। ঋতুর পাশে নদী। বালু তোলার শব্দ। কৃষকের সমাধিতে রোপন করো দূরাগত ফসলের ঘ্রাণ। তারপর যথারীতি কান্নার দিকে যাও। নিজস্ব চোখের কাছে হাত পেতে ডাকো মেঘমল্লার, বর্ষার মৌসুম।
বর্ষা জাগে
বর্ষা জাগে, একেকটি গানের ভেতর। সমূহ আলিঙ্গনের ভেতর। কতিপয় সুর— থেমে থেমে জেগে ওঠে। বর্ষা জাগে। রুটির বক্রহাসি আর মাংসে লুকিয়ে থাকা শীর্ণকায় হাড়— আমি খুঁজে পাই কান্নার পাশে। আলিঙ্গনরত ঠোঁট— আমার আত্মকথা যেন! ব্যাকুল পিয়ানো বাজে দাঁতের ছদ্মবেশে। ওকে শাস্তি দাও। ওকে শাস্তি দাও শুধুই অবসর। ঘুমের ভেতরে যা তাকে হরণ করে— অশান্তিতে। জেগে উঠে সে মেলে ধরে তুমুল বর্ষাতি। বেরিয়ে পড়ে বৃষ্টির ভেতর।
বর্ষামুখর দিন
অসমাপ্ত বর্ষামুখর দিন। পুরনো ছাতার স্মৃতিরা একে একে ভীড় করে এই ঋতুর ধারে। বৃত্তাকার চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। এইবার ছিলো ডোরাকাটা, লাল-শাদা ছাতা, গৃহস্থ করেছি তাকে বামালসমেত। হারাবে কোথায়, কোন গৃহপাশে! জ্যান্ত আসামি ধরে গুম করে দেব পুলিশের মতো। আটকা পড়ে যাবে দুরূহ শোকবার্তায়। একে একে অজস্র দুপুর পেরিয়ে জমা হবে মকরবাগানে। খুঁজে পাবে সেলাইমেশিন, আবর্জনা ঘেটে। বাড়ি ফিরো আপন উদ্যমে, কেউ তোমাকে ডাকতে আসবে না। প্রবীন পঙ্গপাল কিংবা মৃত শিশুদের অমরত্ব নেই। চলে যাও সুসংবাদ পেরিয়ে শ্রাবণের মাঠে।
সাঁতাও
দুপুরে বর্ষা এলো, মধ্যরাতে ফের। জলের তলে অবাক পাহাড়, বিম্বিত বুঝি— নাচে, দুলে দুলে ওঠে পাহাড়চূড়ার ফুল! এমন আনন্দ থেকে দূরে সরে যায় স্মৃতির ঈর্ষা, কিছুটা নির্ভার তবু স্বাদের আড়ালে। পুরনো বনের অধিক সবুজ সমুদ্র বুকে; ঝাঁকে ঝাঁকে ঢেউ লাজুক ভঙ্গিতে নেচে ওঠে আর বাতাশের সুরে কথা কয়। কিছুটা ঈর্ষা আমাদের বাগানবাড়িতে পোঁতা ছিল। ঘঁষা কাচের মতো প্রেম চলে এসেছিলো নদীর ছন্দে, উদ্বাস্তু পাতার অধিক।
রুবেল সরকার
প্রস্থান
ছুঁতে-না-ছুঁতেই মিলিয়ে যায় যে বৃষ্টি
তারে বাঁধতে পারি না মনছুতোয়—-
এভাবেই ডোবে তরী অকস্মাৎ, তীরে
একা আমায় রেখে ফ্রেমবন্দি ঘাটে!
ঊধাও তার ঘ্রাণে খুলে বসি তোমায়
হাওয়ারা উড়িয়ে দিচ্ছে কথোপকথন!
ফুটি ফুটি ভোরের জায়নামাজে, ধীরে
লুটিয়ে পড়ছে আলো ও আর্তনাদ…
থেকেও নেই কোথাও, এমন বিস্ময়ে
পাখিডাকে দুলে ওঠে ফুলরেণুশিস—-
আবারও বৃষ্টি নামে, নামে ‘তুমি তুমি’ ঘ্রাণ
ষোড়শী জুন এসে মুছে দেয় অশ্রুদাগ!
এ-ও নির্বাসন, নিরবচ্ছিন্ন ব্যথাজ্বর
ঘাসে ঘাসে লেগে থাকা আকুলিবিকুলি!
এভাবেই ছিটকে যায় নোঙর, হৃৎপিণ্ডে
এক তোমায় রেখে আমার রক্ত ও শ্বাসে।
নোমান নজরবী
বৃষ্টিদিনে লিখিত
এ বৃষ্টি আদর আদর
ক্ষীর নরম হয়ে আছে মাটি
সেই মমতায় একটি ছোট্ট কালো বীজদানা
বকুল বা শিউলি চারা হয়ে
নিজেকে রুয়ে দিতে ইচ্ছে হয়—
আঁধারই জন্মকেন্দ্র—তার অভ্যন্তরে
সুগন্ধি শরীর নিয়ে উঠবো বেড়ে
আর রটে যাবো মনের পাড়ায়—এই টুকু চাই;
বিকেল বিলীন হলে রাতের জলশায়
জোস্নার মতো ফুটে থাকবো থোকাথোকা সাদা—
তারপর ভোর আসে পৃথিবীর জলুসে ও ঘাসে
মায়ের শাড়ীর মতো শোভিত হয়ে ছড়িয়ে থাকবো উঠান—
আমার মা ভালোবাসে এসব ফুলের ঘ্রাণ।
জহির রিপন
উদাসীনতা
সুন্দর ফুলগুলো ফুটে অন্ধকারে
প্রবল জ্বরের পৃথিবীতেও বৃষ্টি হয়
ফুলগুলো ভিজে পৃথিবীর জমিনে
ফুল ফুটে, ফুটোক। বৃষ্টি হয়, হোক।
বৃষ্টির তোপে ফুল যদি ঝরেও যায়,
যাক। বিচ্ছেদের জগতে আমার কী?
আমার প্রেমিকা দূরের শহরে থাকতো
এখন সে দূরের দেশে থাকে, থাকুক।
মন্দিরা এষ
অন্ধ জীবন
এই বৃষ্টি অকারণ
ঝাপসা কাঁচের এপারে অহেতুক দাগ।
গাছেদের মনোটনি কেটে যাচ্ছে হয়তোবা
এ রকম সাদা আকাশ;
অনুচ্চ কান্নায়-ক্লেদে
প্লাবন আসেনি কখনও।
একটি অন্ধ বিকাল তবু দাঁড়িয়ে একা;
আমি তার কাঁধে হাত রেখে পার করি, পার হই
অন্ধ-জীবন!
আজমাঈন তূর হক
আলেয়ার জন্য
যায় যদি এই দিন
দুপুর লাফ দেয় সন্ধ্যায়
দোনলা বিরহের বন্দুক থেকে
টেক্সটের ধোঁয়া ওড়ে।
নিখুঁত হেডশট, খুলি থেকে মন
গলে রোদে পড়ে থাকবে
ঘাম হবে ভৈরবী কুকুরের নাকে।
সে-ও পরে মেঘ হলে, ঘুরে ঘুরে
শিকারীর বাগানে হাসনাহেনার ঝড়,
কেউ বলবে না- এই বৃষ্টিতে রাগের গন্ধ নাই।
প্রত্যেক বিদায়ের চিহ্ন ভিজা রাস্তায়
মেখে আছো লাল হয়ে, রেডিওতে জমজমাট
খুনের খবর ছিল বেথোফেন বিরতি-তে।
শ্রী দেব
একটি আষাঢ়ে কবিতা
একটি আষাঢ়স্য দিনে, তুমি বর্ষাদুপুর মেয়ে
ঘনস্নানের কাক আমি, ডানা ঝাপটিয়ে—
এমন ডানা ঝাপটানোর ভেতর
কয়েকটি দ্বিধার মেঘ
রোদ তাড়িয়ে বেড়ায় তোমার চারপাশে।
মেঘে মেঘে এলিয়ে দেয় শরীর
ঝাপসা কিশোরী মেদুর,
পেতে দেয় বিছানা নরম
কদম ফোটা ঘ্রাণ।
এই কদম ফোটার দিনে, তুমি ঋতুবতী গাছ
অধিক চঞ্চল আমি— এক বহতা বাতাস।
এমন বহতার ভীড়ে
সুন্দর, ধীরে খোলো ভাঁজ
আরও ধীরে মিশে যাও আরেক সুন্দরে
সোহরাব ইফরান
তিস্বর
আমার ঘুমানোর জায়গাটা; জানালার পাশেই,দুই দিন ধরে বৃষ্টির স্পর্শেই ঘুম ভাঙছে। যেখানে মিলিয়ে দিচ্ছিলাম, সে সব দৃশ্যচক্রে— রঙের বধিরতায়; ছিল নিজস্ব তরলের ব্যাবহার। জলে ভেসে যাচ্ছে শ্বাসমূল! তখনো খোলামেলা শিরা উপ-শিরা আমার; প্রয়োজন ছিল ভিজে ওঠবার— সকল শুকনো আর্ত-প্রান্তর জুড়ে। তেমন বৃষ্টি হলো আজ।প্লাবনের প্রতিশ্রুতি তবু কে দেয়? ফুসফুসের প্রান্তরে চলকে উঠা গুড়ো গুড়ো নীল মুখ; ভাবছি এত উঁচুতে মেঘেরা রসালো হয় কেন ঘাঘরা মেলে! হলুদ রেনু থেকে সময়ের গোলক ছেড়ে পদ্মেরা পাঁপড়ি মেলে দিয়েছে;
যার সম্ভাব্য সকল দিকে হৃদয়। অদৃশ্য মেরুনের— ভার্টিক্যাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে নামে বৃষ্টি। বুনো ঘ্রাণ এসে পড়ে চোখের আলস্য ভেঙে,বহুকাল সুড়ঙ্গ খুঁজেছিল—যে সরীসৃপ, আছে বুকের কয়েক ফিট গভীরে। ডাকছে একটা কবুতরের পাল কার্নিশের উপরে, জানালা থেকে তাদের দেখতে পাইনা; তবু তাদের মেদের কথা ভেবে; আমার পালক ছড়াতে ইচ্ছে হয় আজ! খয়েরী রক্ত ঘসে—অরুচি হোক মাংসের প্রতি; আমিও লাফিয়ে চলি আজ; মসৃণ ফোঁটা- দেহ-নদীর; পাড় ভাঙার শব্দে। বন্যার পর শ্যাওলার দাগ ছেড়ে জল ফিরে যাবার পথে গলে যাক পোড়ামাটির পুতুল। জেগে ওঠুক রঙের মহিমা; পলিতে—বালিতে!
আপন দেবনাথ
আষাঢ়িয়া জ্বর
জ্বরের রাতে শিথানে বৃষ্টির দরদী ডাক। তার ডাকনাম মরন। ভেজা পাউরুটি মুখে চিনি মাখা শূন্যতার ভেতরে একাকী এক বিন্দু থেকে দেখছি দূরের ইউনিভার্স। কেউ ডাকছে না কেনো আমাকে? দেখি করাতের সামনে আমার দুচোখ। নিবুনিবু করে বাজছে রাগ পিলু। বীভৎস স্বপ্নের ভগবান জানলো বাংলা কবিতা লিখতে পারি আমি। মফস্বল ঘিরে বাড়ছে ডাক্তারের অসুখ। নবদল বদলাতে চায় এই জনপদের মেঠো পথ, তারা ধুলো গায়ে নেউলের মতো আমার বিছানার পাশে বৈয়ম ভর্তি শুকনো বড়ই চাটছে। আর শিউরে উঠছে বাংলা সিনেমার নায়িকা। তার পিঠে আমার কপালের তাপ লাগিয়ে দিতে মনেভর করেছে আষাঢ়িয়া জ্বর।
শৈবাল নূর
উচ্চ মাধ্যমিক
ঝুম বৃষ্টির মাঝে সাঁকোতে দাঁড়িয়ে একা কি ভাবছো —
নদীতে বৃষ্টি পড়তেই স্মৃতিরা কেমন ঝিরঝিরে হয়ে গেলো
নীলিমা —একাই ডেকে চলেছে, কেঁদে চলেছে
তখন তো কলেজে পড়ি
অভিমানে তুমি পেরিয়ে গেলে একান্ত সাঁকো, নদীর ঝিরঝির
রুম্মানা জান্নাত
‘মিস করি’ সিনট্যাক্সের বাইরে, তোমাকে
৪০.
বৃষ্টির সম্ভাবনা নাই তবু তোমার থেকে দূরে আছি-
কল্পনা করি পৃথিবীতে এখন আষাঢ় মাস।
একটা ছিপছিপে দোকানে আমরা আটকা পড়ব বলে
আকাশে মেঘ জমে আছে।
জানি না, পাশাপাশি দাঁড়ালে সুখী দেখায় কি না
বাতাসে বাউল গন্ধ,
একটা সুসংবাদের মতো আচমকা মনে পড়ে যাও
যেখানেই থাকি
জানালার ছলটুকু এই
পর্দা সরাতে গেলে তুমি যেন আমার কথাই ভাবো
সারাদিন কত দৃশ্য হয়ে উঠি
বারান্দায় শুকনা কাপড়, কোনো দুপুরে ঘুমের মধ্যে
বিড়ালের নির্জনতা ঢুকে যায়
শোন,
পৃথিবীতে কত গান!
আর প্রতিটা সুরের মধ্যে আমাদের হেঁটে যাওয়া আছে
রিদওয়ান নোমানী
তাবৎ খুনি
দীর্ঘ অপেক্ষার পর তোমার সোহবতের মতো বৃষ্টি নামলো
বৃষ্টির প্রত্যেকটা ফোঁটা গিয়ে বিধলো আমার অশান্ত অন্তর
আলাপনের এমন প্রশস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে
আমি কেবলি চলাচল দেখি…
আজ তুমুল বর্ষণে শাস্ত্রের অধিক ভিজলাম
কন্যা মোরশেদা প্রণীত বিরহকালীন বর্ষার মতো।
অন্তরের দোলাচলে বিরহ ছড়ানো মাবুদ_
মাবুদের ডায়েরি জানে
বৃষ্টির সুনিপুণ বিন্যাসে
কতটা উর্বর হয় অনুর্বর শস্যক্ষেত ।
ইশকুল পালানো বৃষ্টিভেজা সমস্তটা পথ
বুড়িগঙ্গার কোলঘেঁষে যাওয়া
সেসব ফুলস্টপের পাশেও তুমুল বর্ষণ হয়।
মর্সিয়া সঙ্গীতে বৃষ্টির সুর
আর্দ্র মায়াবী করুণ
এ বৃষ্টি, বৃষ্টি যেন নয়
খুন করার মানতে বেড়িয়ে পড়া
তাবৎ খুনি।
সিদ্ধার্থ অভিজিৎ
বর্ষালি
সাইলেন্ট বৃষ্টি নামলো চোখের পাড়ায়।
এক্সিলেটর ব্রেকের ব্যস্তানুপাতিক—
কার্যত,
কদমের বনে উপর্যুপরি জন্ম নেয়
ফলের ছানারা।
বেহায়া কালার বাঁশির বর্শা
হৃদয়ের সতীচ্ছেদ করে অহর্নিশ।
রোদ্দুর রিফাত
বৃষ্টি দিনের কবিতা
রোদের মিনার চাপা পড়েছে মেঘের পাতায়
পাতার শরীর হালকা হলেও ছায়া তার দীর্ঘ—
তোমার অন্তর্বাসে বন্দি জোড়া মেঘখণ্ড
ছাড়িয়ে নিবো জল-সাতারের আঙুলে
ধ্বসে যাবে মেঘ আর ভিজে যাবো আমরা।